মহাকাশ যুদ্ধে যেসব দেশ এগিয়ে

97
0

জলে, স্থলে আর আকাশে তো যুদ্ধ চলছে; এই কথা তো সবাইই জানে। কিন্তু আপনি জানেন কি মহাকাশ নিয়েও এখন যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। বিগত কয়েক দশক ধরেই এই যুদ্ধের প্রস্তুতি হয়েই চলছে। কিন্তু এখন অবধি কোন যুদ্ধ হয়নি। বরং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই চলছে এক ভিন্ন লড়াই। মূলত এই ক্ষেত্রে মহাকাশ যুদ্ধের ক্ষেত্রে কে কতটা প্রস্তুত তাই নিয়েই চলছে যুদ্ধ। চলুন তাহলে মহাকাশ যুদ্ধ নিয়ে দারুণ চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য জেনে আসি-

মহাকাশ সেনা

মহাকাশ বিষয়ে যে কোনো কিছুতেই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে যে দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে মহাকাশের বিভিন্ন তথ্য পৃথিবীবাসীর কাছে প্রেরণ করতে। সাম্প্রতিককালে তারা মহাকাশ সেনা বা স্পেস ফোর্স নামে এক বিশেষ সামরিক বাহিনী তৈরি করেছে।

এই বাহিনী মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশে স্বার্থরক্ষা সংক্রান্ত কাজে সাহায্য করবে। বিশেষ করে মহাকাশ গবেষনায় বিশেষ তদারকি করবে। তবে যুদ্ধের জন্যেও সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। তবে এর আগেও স্পেস ফোর্সের মতোই ১৯৮৪ সালে স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনশিয়েটিভ (এসডিআই) তৈরি করা হয়েছিল।

আমেরিকার স্পেস ফোর্স টিম। Image Source: military.com

হাইপারসনিক মিসাইল

হাইপারসনিক মিসাইল হচ্ছে এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র যা শব্দের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুতগতিসম্পন্ন। এই ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে এসে আঘাত হানার পূর্বে এটাকে চিহ্নিত করা বা মাঝপথে এটিকে ধ্বংস করে দেয়া খুবই কঠিন। তাই, এই ক্ষেপণাস্ত্রই বর্তমানে আধুনিক ও ভবিষ্যতের উইপেন বলে ভাবা হচ্ছে। চীন এমনই এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে সাম্প্রতিককালে যা শব্দের চেয়ে ৫ গুণ গতিসম্পন্ন। যদিও চীন গণমাধ্যমে বলেছে যে এটি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নয় বরং পুনর্ব্যবহারযোগ্য একটি মহাকাশযান।

অন্যদিকে, রাশিয়া গেল বছর অক্টোবরে তাদের পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে দুটি হাইপারসনিক মিসাইলের পরীক্ষা চালায় সফলভাবে। শব্দের চেয়ে ৯ গুণ বেশি গতিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্র জিরকন ১ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুকেও আঘাত হানতে পারে। এছাড়াও, আরো কয়েক ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র আবিষ্কার করেছে রাশিয়া।

অবশ্য এরই আগে মহাকাশ গবেষণায় এগিয়ে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের হাইপারসনিক মিসাইলে সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্রটির নাম রাখা হয়েছে রেথিওন; এটিও শব্দের চেয়ে ৫ গুণ গতিসম্পন্ন। এছাড়াও, উত্তর কোরিয়াও একের পর এক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাচ্ছে। যদিও গণমাধ্যমে এমন কিছু জানায়নি তারা।

রাশিয়ান হাইপারসনিক মিসাইল। Image Source: swarjya.com

 

ফাইটার স্যাটেলাইট

ফাইটার বিমান বা জেট বিমানের কথা তো শুনেছেন; কিন্তু ফাইটার স্যাটেলাইটের কথা কি শুনেছেন? এমনই এক স্যাটেলাইট পলিয়ট নিয়ে সেই ১৯৬৩ সাল থেকেই কাজ করে চলছে রাশিয়া। এমনকি ১৯৮৪ সালে তাদের এমন এক উপগ্রহ নজর কেড়েছিল গণমাধ্যমের। এই উপগ্রহ নিজের কক্ষপথ থেকে সরে বিভিন্ন কাজকর্ম করতে এবং অনেক নিশানার ক্ষতিও করতে সক্ষম।

এমনই এক উপগ্রহ ‘শিজিয়ান সিরিজ’ নিয়ে কাজ করছে চীন। ২০০৭ সালে মাটি থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র মেরে নিজেদেরই একটি উপগ্রহ ধ্বংস করে নিজদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে তারা।

সাইবার ওয়ার

একটা সময় যুদ্ধ যে শুধুমাত্র প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে যাবে সে তো সবাইই জানতো। সেই একটা সময় কিনু চলে এসেছে। বর্তমানে সাইবার বা ইন্টারনেটের দুনিয়ায় হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্র। পাশাপাশি আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স তো আছেই শত্রুপক্ষকে তাক লাগিয়ে দেয়ার জন্য। ঘরে বসেই যে বিশাল এক নেটওয়ার্ক বিগড়ে দেওয়া যায় মুহূর্তেই তা প্রমাণ হয়েছিল কয়েক বছর আগেই।

ছোট্ট একটা কোড বা ম্যালওয়্যারের কারণে ইরানের পরমাণু জ্বালানি তৈরির সেন্ট্রিফিউজ হ্যাক হয়ে এত জোরে ঘুরতে শুরু করেছিল যে, থামানোর পরেও সেগুলো নাড়ানো সম্ভব হয়নি। মহাকাশের স্যাটেলাইটকে হ্যাক করাও খুব একটা সমস্যা হবার কথা নয়। তাই সাইবার ওয়ারও যুদ্ধে দুর্দান্ত ভূমিকা রাখবে বলে জানা যায়।

বর্তমানে সাইবার বা ইন্টারনেটের দুনিয়ায় হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্র। Image Source: insurancejournal.com

মহাকাশ যুদ্ধে কোন কোন দেশ এগিয়ে আছে-

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

বর্তমানে পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে থাকা কর্মক্ষম মহাকাশযানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। অ্যাপোলো মুন ল্যান্ডিং মিশন, স্কাইল্যাব স্পেস স্টেশন, স্পেস শাটল, ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আইএসএস), মার্স এক্সপ্লোরেশন রোভার-অপরচুনিটি এবং কিউরিসিটি; এসবই দেশটির মহাকাশ কর্মসূক্সীর মূল ভিত্তি এবং নাসা হচ্ছে এমন কর্মসূচী সম্পাদনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

১৯৫৮ সালে মহাকাশে প্রথম উপগ্রহ প্রেরণ করার পর থেকে এখন অবধি দেশটি যোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মিসাইল ডিটেকশন, ওয়েদার, টেকনোলোজি, নেভিগেশন এবং সারভিল্যান্স স্যাটেলাইট সর্বক্ষেত্রেই আছে এগিয়ে।

চীন

যদিও অনেক দেরিতে মহাকাশ গবেষণায় নেমেছে চীন তবুও ইতিমধ্যেই মহাকাশযানের দ্বিতীয় বৃহত্তম বহরে পরিণত হয়েছে দেশটি। বর্তমানে তারা নেভিগেশন স্যাটেলাইট, রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট, কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট, সার্ভিল্যান্স, স্পেসক্র্যাফটসহ মঙ্গল অভিযানের রোভারের বিশাল বহরের মালিক দেশটি।

স্যাটেলাইট পুনরুদ্ধার এবং যাত্রীবাহী মহাকাশ ফ্লাইট পরিচালনা করার ক্ষমতা সম্পন্ন তিনটি দেশের একটি হচ্ছে চীন। চীনের প্রধান মিশনের মধ্যে রয়েছে তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশন-১, মানব পরিচালিত মহাকাশ ফ্লাইট প্রোগাম শেনঝো, চাইনিজ লুনার এক্সপ্লোরেশন প্রোগ্রাম।

চাইনিজ লুনার প্রোগ্রামের থ্রিডি ইমেজ। Image Source: chinadaily.com

রাশিয়ান ফেডারেশন

১৯৫৭ সালে স্পুটনিক ১ কৃত্রিম উপগ্রহ উতক্ষেপণের মধ্য দিয়ে মহাকাশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। দেশটি বর্তমানে যোগাযোগ, বায়মন্ডল ও আবহাওয়া সংক্রান্ত এবং রিকনেসেন্স স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণায় তৃতীয় বৃহত্তম বহরের অধিকারী। মনুষ্যচালিত মহাকাশযান সয়ুজ, স্যালিউট ১ স্পেশ স্টেশন এবং লুনোখড ১ স্পেস রোভার, তাদের প্রধান মিশন।

জাপান

১৯৭০ সালে জাপান মহাকাশে তাদের প্রথম স্যাটেলাইট ওসুমি উৎক্ষেপণ করে; যা তখনকার সময়ে দেশীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ক্ষমতার অধিকারী চতুর্থ রাষ্ট্র ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের পর। বর্তমানে কমিউনিকেশন, মেটিওরোলজিক্যাল, পৃথিবী পর্যবেক্ষন এবং জোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্যাটেলাইট বহরের অধিকারী। জাপানিজ স্পেস প্রোগ্রাম ছিল জাপানিজ এক্সপেরিমেন্টার মডিউল, ট্রান্সফার ভেহিকল এবং লঞ্চ ভেহিকল।

কিবোর অংশবিশেষ। Image Source: nasa.com

 

যুক্তরাজ্য

১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য তাদের প্রথম স্যাটেলাইট অ্যারিয়েল-১ উৎক্ষেপণ করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পর স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশ ছিল। বর্তমানে বেসামরিক এবং সামরিক স্যাটেলাইট, পৃথিবী পর্যবেক্ষক স্যাটেলাইট, বৈজ্ঞানিক ও অনুসন্ধানী মহাকাশযানসহ প্রচুর উপগ্রহ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকে। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির বৃহত্তম আর্থিক অবদানকারীদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যুক্তরাজ্য।

 

 

 

Feature Image: Aerospace Technology
References: 

01. The 10 countries most active in space. 
02. 12 Most Advanced Countries in Space Technology.