প্রজেক্ট কিউব: ভবিষ্যতের দুনিয়ায় স্বাগতম

99
0

বহুকাল ধরেই সৌদি আরব, তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, বিস্তীর্ণ মরুভূমি এবং তেলের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। তেল শিল্পের ওপর অধিক মাত্রায় নির্ভরশীল এই দেশটি বর্তমানে তাদের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। বিশেষ করে দেশটি তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ট্যুরিজমে আলাদা করে নজর দিচ্ছে। আর এরই ফলশ্রুতিতে তারা নিত্যনতুন বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছে। যার একটি হলো প্রজেক্ট কিউব।

সৌদির এই স্বপ্নদর্শী প্রকল্পটি দেশটির অর্থনীতি এবং সমাজকে নতুন আকার দিবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। মনে রাখা জরুরি, প্রজেক্ট কিউব সৌদি সরকারের শুধুমাত্র একটি একক প্রচেষ্টাই নয় বরং এটি একটি বহুমুখী উদ্যোগ, যার লক্ষ্য সৌদি আরবের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল এবং বৈচিত্র্যময় করা, পাশাপাশি তেলের আয়ের উপর দেশটির নির্ভরতা হ্রাস করা। প্রজেক্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদির বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের দ্বারা চালু করা হয়েছে, যা উদ্ভাবন এবং রূপান্তরের প্রতি জাতির দৃঢ় প্রতিশ্রুতিকেই ইঙ্গিত দেয়।

প্রজেক্ট কিউবের প্রধান লক্ষ্যই হলো সৌদি আরবকে তেলের উপর থেকে তার আদি ঐতিহ্যগত নির্ভরতার বাহিরে নিয়ে আসা। পরিকল্পনাটির সাথে আরও একাধিক বৈচিত্র্যময় এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিষয়াবলি জড়িত। ২০৩০ সালের মধ্যে, সৌদি সরকারের লক্ষ্য হলো দেশটিতে তেল শিল্পের বাইরের যে খাতগুলো রয়েছে সেগুলো যেন সৌদির জিডিপিতে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখতে পারে সে ব্যবস্থা করা।

সৌদির স্বপ্নদর্শী প্রকল্প প্রজেক্ট কিউব, Image Source : Dezeen

আর উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি হলো সৌদির অত্যাধুনিক এই প্রজেক্ট কিউবটির মূল স্তম্ভ। ২০৩০ সাল নাগাদ সৌদির লক্ষ্য স্টার্টআপ, গবেষণা কেন্দ্র এবং প্রযুক্তি-চালিত শিল্পের জন্য দেশটিতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, যেন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের দিক দিয়ে দেশটি বিশ্বব্যাপী একটি রোল মডেলে পরিণত হয়। তাছাড়া, দেশটির বর্তমান ক্রমবর্ধমান যুব জনসংখ্যার সাথে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্যও সর্বাগ্রে এই প্রজেক্ট কিউব কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রজেক্ট কিউব বাস্তবায়িত হলে তা লক্ষ লক্ষ নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করবে তো বটেই বিশেষ করে প্রযুক্তি, বিনোদন এবং পর্যটনের মতো খাতগুলোয় সৌদির জন্য নতুন করে আরও একবার অর্থনৈতিক উন্নতির সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হবে। শুধু তাই নয়, প্রকল্পটি সৌদি নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার উপরও বেশ প্রভাব রাখবে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিনোদন এবং পর্যটন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ। যা ২০৩০ সাল নাগাদ দেশটিকে তার অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিক থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

এনইওএম মেগাসিটি প্রজেক্ট কিউবের অন্যতম একটি অংশ। এটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি ভবিষ্যত শহর, যা ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে গড়ে তোলা হচ্ছে। মূলত সৌদি সরকারের এনইওএম গড়ে তোলার লক্ষ্য হলো উদ্ভাবনের হাব হিসেবে বিশ্বে নিজেদের আত্নপ্রকাশ ঘটানো, সেই সাথে সারা বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোসহ গবেষকদের এবং বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা। তাছাড়া এনইওএম, যেটিকে সৌদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রজেক্ট কিউবের মুকুট হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিশ্বের বুকে এটি একটি যুগান্তকারী মেগাসিটি হবে।

এনইওম মেগাসিটির কিছু অংশ, Image Source : Arabian Business

তাবুক প্রদেশে ২৬,৫০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত এলাকা নিয়ে, এই এনইওএম নামক ভবিষ্যতের শহরটিকে ডিজাইন করা হয়েছে। যা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যতে উচ্চমানের জীবনমান প্রদর্শন করবে। শহরটি সম্পূর্ণরূপে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস দ্বারা চালিত হওয়ার লক্ষ্যে তৈরি, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে পরিবেশ-বান্ধব শহরগুলোর মধ্যে একটিতে রূপান্তর করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে৷

তবে শুধু তাবুকেই নয়, সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এমন আরও অনেক শহর এই প্রজেক্ট কিউবের আওতাভুক্ত। ইতিমধ্যেই সৌদি আরবের রাজধানী শহর জেদ্দাকে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে আরও ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যেটিও এই প্রজেক্ট কিউবেরই একটি অংশ।

এছাড়া, সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন, এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম এর কার্বন উৎপাদনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে এখানটায় ব্যবহার করা হয়েছে উন্নত সব প্রযুক্তির। সৌদি সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী যতদূর জানা যায়, অত্যাধুনিক এই শহরটি নিছক একটি শহরই নয় শুধু, এটি উদ্ভাবনের জন্যও একটি জীবন্ত পরীক্ষাগার।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি এবং উন্নত উৎপাদনের যুগান্তকারী বিষয়গুলোকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে গবেষণার কেন্দ্র এবং বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলো এখানে অদূর ভবিষ্যতে একত্রিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রজেক্ট কিউবের আওতাধীন কিছু প্রকল্পের অংশ বিশেষ, Image Source : Topos Magazine

বর্তমানে সৌদি সরকার লোহিত সাগরের উপকূলরেখা বরাবর অবস্থিত অঞ্চলগুলোয় একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে যা প্রজেক্ট কিউবেরই আওতাধীন। ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি সরকারের এই প্রকল্পটি হাতে নেয়ার অন্যতম এক কারণ অঞ্চলটিকে তারা এক বিশ্বমানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

প্রজেক্ট কিউব সৌদি ভিশন ২০৩০ এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। নতুন এই প্রজেক্টটি দেশটির স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পর্যটন এবং বিনোদনসহ বিভিন্ন খাতে নিজেদের রূপান্তর ঘটানোর জন্য তাদের কাছে দীর্ঘমেয়াদী এক পরিকল্পনার অংশ বিশেষ।  শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এই প্রজেক্ট কিউবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বর্তমানে এটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিং আবদুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিনির্মাণ এবং নতুন নতুন গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের উদ্ভাবন লক্ষ্যে অবদান রাখছে। এছাড়াও, লোহিত সাগর প্রকল্পের বাইরে, অন্যান্য পর্যটন গন্তব্য যেমন: জেদ্দা, আল-উলা এবং দিরিয়াহ নামক জায়গাগুলোকে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য প্রদর্শনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যেগুলো এই প্রজেক্ট কিউবেরই অংশ।

যতদূর অনুমান করা যায়, এই প্রজেক্ট কিউব সৌদির রাজস্ব প্রবাহকে বৈচিত্র্যময় করবে, পাশাপাশি দেশটিতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত করে সৌদির অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে বলেই আশা করা হচ্ছে। সৌদির এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যবসা এবং উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করবে।

প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের ওপর মূল ফোকাস রেখে তৈরি হচ্ছে প্রজেক্ট কিউব, Image Source : Arabian Business

প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের উপর মূল ফোকাস রেখে, প্রজেক্ট কিউবের লক্ষ্য সৌদি আরবকে ভবিষ্যত পৃথিবীর বুকে বৈশ্বিক প্রযুক্তির নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই তারা বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে। তাই দেশটির বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা ও উন্নয়নকে তারা আরও উৎসাহিত করছে। তাছাড়া, প্রজেক্ট কিউব সর্বদাই নিজেদের টেকসইয়তা রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণে এবং দায়িত্বশীল সম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর আলাদা ভাবে জোর দিয়ে থাকে।

প্রজেক্ট কিউব সৌদি আরবের একটি নতুন যুগের দুঃসাহসিক সূচনা মাত্র। এটি দেশটির অর্থনীতিকে রূপান্তর ও বৈচিত্র্য আনার জন্য, উদ্ভাবনকে ক্রমাগত উৎসাহিত করে চলেছে। পাশাপাশি দেশটির সাধারণ নাগরিকদের জীবন ধারার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

এই দূরদর্শী প্রকল্পটি উদ্ভাসিত হওয়ার সাথে সাথে, এটি কেবল সৌদি রাষ্ট্রের পুনর্নির্মাণই নয় বরং অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ স্থায়িত্বের জন্যও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা একটি দূরদর্শী জাতি হিসাবে সৌদি আরবকে বিশ্বের বুকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে সক্ষম। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই সৌদি বর্তমানে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং সংস্কৃতিতে একটি বৈশ্বিক পাওয়ার হাউস হওয়ার পথেই রয়েছে।

 

 

 

Featured Image: Construction Weeks Online 
References: 

01. Saudi Arabia Unveils Design for the Mukaab. 
02. Saudi Arabia: Cube complex Mukaab. 
03. The Mukaab: Huge cube city planned in Saudi Arabia.