সিডনি অপেরা হাউজ: আধুনিক স্থাপত্যকলার অনন্য এক নিদর্শন

775
0
সিডনি-অপেরা-হাউজ-আধুনিক -স্থাপত্যকলার-অন্যতম -নিদর্শন।
সিডনি-অপেরা-হাউজ-আধুনিক -স্থাপত্যকলার-অন্যতম -নিদর্শন।

সিডনি অপেরা হাউজ, নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠ আলোকোজ্জ্বল এক আধুনিক স্থাপনা। আধুনিক প্রযুক্তির এক বিস্ময়কর স্থাপত্যশৈলীর নাম অপেরা হাউজ। যার অবস্থান অষ্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যের সিডনি বন্দরে। এই শহরের প্রধান আকর্ষণ হলো সিডনি অপেরা হাউজ। এটি এমন একটি প্রকৌশল বিস্ময় যার স্থাপত্যশৈলী আর কারুকাজ, ভবনটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, সিডনি অপেরা হাউজ বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু পরিণত হয়েছে।

সিডনির অপেরা হাউজ দেখতে সাদা পালতোলা নৌকার মতো। ভবনটির সাদা চূড়া যেন সিডনি বন্দরের অবিকল নৌকার একটি বহরের মতো দেখায়। আর তাই সব মিলিয়ে ভবনটি যেন অন্য রকম নান্দনিক মাত্রা যোগ করেছে বন্দরটিতে। এই অসাধারণ ভবনটি মহাসাগরের এক প্রান্তে তৈরী করা হয়েছে যা দূর থেকে দেখতে অনেকটা উপত্যকার মতো মনে হয়। আর তাই এই যাদুকরী নান্দনিক ভবনটি বিশ্বের অন্যান্য স্বীকৃত স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ২০০৭ সালে অপেরা হাউজকে স্বীকৃতি প্রদান করে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বন্দরের বেনেলং পয়েন্ট থেকে রৌদ্দকরোজ্জ্বল দিনে অপেরা হাউজ যেন তার মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। আর নীল আকাশের নিচে পাইপ টাইল জ্বলজ্বল করে জ্বলে। যখন সন্ধ্যা নামে এখান থেকে চোখ ফেরানো যায় না। বাহারি আলো যখন পানিতে পড়ে, তখন এর রূপ যেন মোহনীয় জাদু দিয়ে চারপাশ ঘিরে রাখে। তাই, বলা যায়, সিডনি অপেরা হাউজ যেন আধুনিকতা আর স্থাপত্য কলার অপরূপ এক মেলবন্ধন। 

সিডনি অপেরা হাউজ
রাতের অপেরা হাউজ-চারপাশে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। Image Source: pinterest.com

সিডনি অপেরা হাউজে দেখার কি আছে?

মূলত, সিডনি অপেরা হাউজ হলো বহুমুখী শিল্পকলার থিয়েটার। আর ঠিক সেই জন্য এই জায়গাটি খ্যাতনামা সকল সঙ্গীতবিদ, নাচিয়ে ও অন্যান্য বিনোদনকারীদের জন্য এক মহামিলনস্থল। তবে জনসাধারণের জন্যও এই অপেরা হাউজটি উন্মুক্ত। আর তাই দর্শনার্থীদের থিয়েটার বা স্টেজ শো দেখার সাথে সাথে পুরো অপেরা হাউজটি ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। তবে টিকিটের বিনিময়ে উপভোগ করা যায় স্থাপত্যকলার এই অপরুপ সৌন্দর্য আর মন-মাতানো সব অনুষ্ঠান।

তবে, শুধু অপেরা হাউজই নয় এখানে আসলে আরও বিভিন্ন স্থানের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে। এর মধ্যে সিডনি হারবার ব্রীজ, সিডনি অলিম্পিক পার্ক, ডার্লিং হারবার, চায়নাটাউন, দ্য রকস, বোন্ডি বীচ অন্যতম। অপেরা হাউজের রেলিংয়ের কাছে নদীর পাড় ঘেঁষে খোলা আকাশের নিচে বসে যেন পুরো সিডনি শহরের রূপই দর্শন করা যায়।

মজার বিষয় হলো, সিডনি অপেরা হাউজ ভবনকে সরাসরি সমুদ্রের জল ব্যবহার করে শীতল করা হয়। এতে বিল্ডিংয়ের গরম এবং এয়ার কন্ডিশনার উভয়কেই শক্তি দেয়৷ অনেক পর্যটক অপেরা হাউজ এবং এর আশেপাশের স্থানগুলো ঘুরে দেখতে চান। কিন্তু এই দর্শনীয় স্থানগুলো উপভোগ করার সর্বোত্তম উপায় হলো যেকোনো একটি পারফরম্যান্সে অংশগ্রহণ করা।

একনজরে সিডনি অপেরা হাউজ 

সিডনি অপেরা হাউজ ভবনটি অপেরা হাউজ ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য সরকারের একটি সংস্থা। নিঃসন্দেহে, সিডনি অপেরা হাউজ-এর দিকে সারাবিশ্বের মানুষের মনোযোগ অনেক বেশি। এর প্রধান কারণ হলো এর আকর্ষণীয় ছাদ। কিন্তু ছাদ ছাড়াও আরও অনেক জিনিস রয়েছে যা কাঠামোটিকে সত্যিই অসামান্য করে তুলেছে। এই ভবনটির তিন দিক থেকে জলে ঘেরা এবং বিশাল স্তূপের উপর দাঁড়িয়ে আছে। 

অপেরা হাউজের কাছেই সিডনি হারবার ব্রিজ। Image Source: unplash.com

একটু ইতিহাস 

ইতিহাসের দিকে তাকালে, দেখা যায় প্রথমে এই হাউজটি অস্ট্রেলিয়ার বাদ্যযন্ত্রের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। তবে এটি একটি সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা দ্বারা পরিচালিত হতো। মূলত, বিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৯৫৫ সালে সরকার এই ভবন পুনরায় নির্মাণের জন্য একটি আদেশ জারি করেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত কোন এই বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়নি। তবে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে একই স্থানে নতুন সঙ্গীত থিয়েটার নির্মাণ করা হবে।

এরই ধারাবাহিকতায়, ১৯৫৬ সালে অপেরা হাউজ নির্মাণের জন্য নকশা আহবান করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এর জন্য ২৩৩টি নকশা জমা পড়ে। ১৯৫৭ সালে সুইডেনের বিখ্যাত নকশাকার জর্ন উটজন অপ্রত্যাশিত ও বিতর্কিতভাবে নকশা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। অনেকগুলো নকশার মধ্যে থেকে জর্ন উটজনের নকশাকে চূড়ান্ত হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়। আর সেই সময় প্রকল্পের তত্ত্বাবধান ও সহায়তার জন্য তিনি সিডনিতে আসেন। তার এই নকশার সম্পূর্ণ পরিকল্পনা শেষ করতে চার বছর সময় লেগেছিল।

ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৩ সালে জর্ন উটজন সিডনিতে তার অফিস স্থানান্তরিত করেন। এরপর, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ সালে উটজন প্রকল্পের কাজ ফেলে রেখে তিনি চলে যান। এর প্রধান কারণ ছিল তাকে সেই সময়কার সরকারের অর্থ প্রদানে অস্বীকৃতি। এমতাবস্থায়, ২০০১ সালে উটজন অস্ট্রেলিয়ায় আমন্ত্রিত হয়ে অবকাঠামোটির নকশাকে পরিবর্তন করে প্রকৃত অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন।

সিডনি অপেরা হাউজ -স্থাপত্য কলার অন্যতম নিদর্শন
থিয়েটার কক্ষ। Image Source: unsplash.com

অপেরা হাউজের অনুষ্ঠানসমূহ

সিডনি অপেরা হাউজে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়েজন করা হয়। বছরে প্রায় ১৫০০টি প্রোগ্রামের মধ্যে উপস্থিত থাকে প্রায় ১.২ মিলিয়নেরও বেশি দর্শক। আর সেখানে অসংখ্য শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন। আগত দর্শনার্থীদের আনন্দ দিতে অপেরা হাউজের বাইরের উন্মুক্ত স্থানে চোখধাধাঁনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর সম্পূর্ন বিনামূল্যে আলোক প্রদর্শনী দেখানো হয়।

তবে তাদের নিজস্ব তিনটি সংস্থা সবচেয়ে বেশি অনুষ্ঠান আয়োজন করে। আর এগুলো হলো অপেরা অস্ট্রেলিয়া, সিডনি থিয়েটার কোম্পানি এবং সিডনি সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা। এছাড়াও অপেরা হাউজের থিয়েটারে ভিতরে ৪টি বড় হলে বিভিন্ন শিল্প সংস্কৃতির অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। যেমন:

  • সিঙ্গার হলরুম-যা একযোগে ২৬৭৯ দর্শক গ্রহণ করতে পারে।
  • অপেরা থিয়েটার-এখানে, ১৫০৭ দর্শকদের জন্য তৈরি করা হয়েছে-এই থিয়েটারে শুধুমাত্র অপেরা নয়, ব্যালে দেখারও  সুযোগ রয়েছে। 
  • নাটকের থিয়েটার-এই স্থানে ৫৪৪ জন একসাথে বসার সক্ষমতা রয়েছে।  
  • মালি ড্রামা থিয়েটার-৩৯৮ জন দর্শকের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক হল এবং ৪০০ লোক একসাথে কাজ করার সুযোগ।

এমনকি প্রধান হলগুলি ছাড়াও, থিয়েটারটিতে আরও অনেক কক্ষ রয়েছে। যেমন- মহড়া কক্ষ, ড্রেসিং রুম, করিডোর, বার এবং রেস্তোরাঁ।  

বেলে নাচের দৃশ্য। Image Source: pixabay.com

বিনোদন 

নিঃসন্দেহে, সিডনির অপেরা হাউজের মূল আকর্ষণ হলো বিনোদন। এটি যেমন স্থাপত্যের একটি অনন্য এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অংশ;  অন্যদিকে, এই অপেরা হাউজটি বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ এবং অন্যান্য বিনোদনকারীদের পরিবেশনার জন্য নিরাপদ স্থান। এই ভবনটি এখন সমগ্র অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রধান ল্যান্ডমার্ক হয়ে উঠেছে। 

এখানে নাটক, অভিনয়, অপেরা এবং ব্যালে নাচ দেখা যায়। বিশ্ব-বিখ্যাত থিয়েটার এবং ব্যালে দল, সেই সাথে অর্কেস্ট্রা, গায়ক এবং অন্যান্য শিল্পীরা তাদের পরিবেশনা করতে এখানে আসেন। আর তাই সাংস্কৃতিকমনা ব্যক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করেছে এই অপেরা হাউজটি।

শুধু বিনোদনই নয় এখানে আসা পর্যটকরা বিখ্যাত সব নাট্য ব্যক্তিদের সাথে ‘পর্দার পেছনে’ দেখা করতে পারবেন। বিভিন্ন শিল্প দলের অভিনেতাদের সাথে দেখা এবং এমনকি থিয়েটারের খাবারও খেতে পারবেন। কারণ সিডনি অপেরা হাউজে বেশ কয়েকটি ভালো বার এবং রেস্তোরাঁ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো অপেরা বার-একটি বার এবং অন্যটি হল রেস্তোরাঁ।

সিডনি অপেরা হাউজের প্রথম পারফর্রমার ছিলেন পল রোবসন। ১৯৬০ সালে নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যাহ্নভোজ খাওয়ার সময় তিনি ওল্ড ম্যান রিভার গানটি পরিবেশন করেন। তবে ভ্রমণপ্রেমীদের এটা জেনে রাখা ভালো যে, প্রতি বছর লুনার নিউ ইয়ার এবং মান্দারিন ট্যুরস উদযাপন করা হয় এখানে। যা দেখতে হাজার হাজার পর্যটক ভীড় করেন। ২০১৯ সালে যার সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫,০০০।

সিডনি অপেরা হাউজে লুনার নিউ ইয়ারের উদযাপন। Image Source: cgtn.com

সিডনি অপেরা হাউজ নির্মাণ ও নির্মাণ ব্যয় 

এই আইকনিক ভবনটি প্রায় ১ দশমিক ৬২ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এবং এর ছাদ তৈরিতে প্রায় ১০ লাখ টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনটির দৈর্ঘ্য ৬০৭ ফুট এবং প্রস্থ ৩৯৪ ফুট। তিনটি ধাপে এটি নির্মিত হয়েছে। প্রথমে বিশাল পোডিয়াম, দ্বিতীয় ধাপে নৌকার পালের মতো ছাদ, আর তৃতীয় ধাপে ভবনটির ভেতরের কাজ।

সিডনির অপেরা হাউজ নির্মাণের মূল খরচ ধরা হয়েছিল ছিল আনুমানিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু অবশেষে ৭ মিলিয়ন ছাড়িয়ে এর চূড়ান্ত খরচ ১০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়।

ভবনটির নির্মাণের সময়কাল হিসেব অনুযায়ী চার বছর ধরা হয়েছিল। কিন্তু ভবনটির জটিল কাঠামোর কারণে নির্মাণ কাজ শেষ হতে নির্দিষ্ট সময়ের থেকেও বেশি লাগে। এই কারণে চার বছরের পরিবর্তে এটি শেষ হতে প্রায় ১৪ বছর সময় লেগেছিল। প্রায় ১০,০০০ নির্মাণ শ্রমিক দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রমে এই অসাধ্য সাধন করে তোলেন।

সিডনি অপেরা হাউজের নির্মাণকাজ। Image Source: asce.org

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন

অবশেষে আসে স্বপ্নপূরণের দিন, ১৯৭৩ সালের ২০ অক্টোবর রাণি দ্বিতীয় এলিজাবেথ অপেরা হাউজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল। যা সরাসরি টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হয়। হাজার হাজার মানুষ তখন এই অনুষ্ঠান পর্দায় উপভোগ করেন। তবে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সেই অনুষ্ঠানে সিডনি অপেরা হাউজের নকশাকার জর্ন উটজনকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি কোথাও তার নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি।

চাইলে যেকেউই সিডনি অপেরা হাউজ ঘুরে দেখতে পারে। তবে সেজন্য দরকার হয় টিকিটের। টিকেট ছাড়াও আশেপাশের ঘুরে দেখতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই কর্তৃপক্ষের। এছাড়া, দলগতভাবেও ঘুরে দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। যারা এখানে নতুন পরিদর্শনের জন্য আসে তাদের জন্য বেশ কয়েকটি গাইডস রয়েছে। গাইডরা দর্শনার্থীদের কাছে এই স্থাপনা নির্মাণের ইতিহাস তুলে ধরেন এবং বিশাল এই স্থাপনাটির সবকিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাণি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। Image Source: thesydneydirectory.com

সিডনি অপেরা হাউজ এমন একটি স্থান, যেই অসামান্য স্থাপনাটি দেখতে পর্যটকেরা সারা বছরই মুখিয়ে থাকেন। সিডনিতে  সাধারণত রৌদ্রোকরোজ্জ্বল আবহাওয়ার জন্য সারা বছরব্যাপী একটি দুর্দান্ত সময়। এরপরেও আরামদায়ক ভ্রমণের কথা চিন্তা করলে, মনোরম আবহাওয়ার কারণে সিডনি ভ্রমণের জন্য গ্রীষ্মকাল সেরা সময়।

 

Feature Image: unplash.com 
References: 

01. Sydney Opera House. 
02. Sydney opera house. 
03. Sydney opera house. 
04. Sydney opera house facts.