ইন্টারনেটের অন্ধকার জগত ডার্ক ওয়েবের গল্প

105
0

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ইন্টারনেট আমাদের জীবনে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এর ব্যবহার ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না। কারণ, আমরা এর মাধ্যমে নানা ধরনের সুবিধা ভোগ করছি। কিন্তু এই ইন্টারনেটের রয়েছে আরেকটি দিক যাকে অন্ধকার দিক বলা যায়। ইন্টারনেটের এই অন্ধকার জগত তথা ডার্ক ওয়েবের গল্প নিয়েই আজকের আলোচনা।

ইন্টারনেটের যে অংশটি আমরা সাধারণ মানুষ ব্যবহার করি তাকে বলে সারফেস ওয়েব। কিন্তু এই সারফেস ওয়েবের আড়ালে আছে ইন্টারনেটের আরো একটি বিশাল জগত। যা পুরো ইন্টারনেট জগতের ৯৬%। এই জগতটিকে বলে ডীপ ওয়েব। আর ডীপ ওয়েবের একটি অন্ধকার অংশ বা জগত হলো ডার্ক ওয়েব। সারফেস ওয়েবে আপনি ডার্ক ওয়েবের কোন কিছুই জানতে পারবেন না। কারণ এই জগতটা অত্যন্ত সুরক্ষিত ও গোপনীয়তা বজায় রেখে কাজ করে। 

ডার্ক ওয়েব এমন তথ্য ব্যবহার করে যা এই সারফেস ওয়েবের অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিনগুলিতে পাওয়া যায় না। এতে প্রবেশ করতে হলে নির্দিষ্ট সফটওয়্যার ও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এখানে যেহেতু সবার পরিচয় গোপন থাকে। তাই অপরাধীদের অভয়াশ্রম বলা যায় ডার্ক ওয়েবকে। অবৈধ এবং অনৈতিক কার্যকলাপের সাথে যুক্ত থাকার জন্য এই ওয়েবের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। 

ইন্টারনেট জগতের তিনটি স্তর। Image Source: avast.com

ডার্ক ওয়েব কি?

ডার্ক ওয়েব হল ইন্টারনেট জগতের গোপন ওয়েবসাইট। যা শুধুমাত্র একটি বিশেষ ওয়েব ব্রাউজার দ্বারাই প্রবেশযোগ্য। এটি WWW. এরই একটি অংশ। একবার এখানে প্রবেশ করলে তা সাধারণ ব্রাউজারের মতোই কাজ করে। এসকল ওয়েবসাইট অত্যন্ত গোপন থাকে এবং গুগলে ইনডেক্স না করার কারণে সার্চ দিয়েও এগুলোকে পাওয়া যায় না। এটি ইন্টারনেটের কার্যকলাপকে গোপন রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়। ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে হলে TOR (The Onion Router) নামে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। এই সফটওয়্যার দিয়ে পরিচয় গোপন রেখে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়।  

ডিপ ওয়েব ও ডার্ক ওয়েবে কিভাবে প্রবেশ করে?

ডার্ক ওয়েব হলো ডিপ ওয়েবের সেই অংশ যেখানে সকল রকম অনৈতিক ও অসামাজিক কাজ হয়। একবার শোনা গিয়েছিল FBI নিজেরাই সুপারকিলারদের নামে ফেক ওয়েবসাইট খুলেছিল, তাই সাবধান! আর কথা না বাড়িয়ে চলুন জানা যাক কিভাবে ডার্ক ওয়েব অ্যাকসেস করবেন। প্রথম শর্ত হলো, আপনাকে নিজেকে লুকিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ, নিজের IP Address (Internet protocol Address) লুকিয়ে রাখতে হবে। 

ডিপ ওয়েব

ডার্ক ওয়েব সম্পর্কে ভালো ধারণা পেতে আপনাকে ডিপ ওয়েব সম্পর্কে জানতে হবে। কারণ, অনেকে এই দুটো বিষয়কে একই মনে করে থাকে। আসলে তা ঠিক নয়। ডার্ক ওয়েব হলো ডিপ ওয়েবের একটি ছোট ভগ্নাংশ (০.০১%)। আপনি যা খুঁজছেন তা যদি গুগলে খুঁজে না পান, তাহলে সম্ভবত এটিকে এখনও ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে খুঁজে পাওয়া যাবে। আর ইন্টারনেটের এই অংশই হলো ডিপ ওয়েব। 

অন্যভাবে বলা যায়, ডিপ ওয়েব হলো ইন্টারনেটের সেই অংশ যেখানে সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে প্রবেশ করা যায় নির্দিষ্ট আইডি, পাসওয়ার্ড, আইপি এড্রেস দিয়ে। কিন্তু এখানকার কোনো তথ্য গুগলের মতো সার্চ ইঞ্জিনে খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য, মেডিকেল তথ্য, অনলাইন ব্যাংকিং তথ্য, রিসার্চ এবং একাডেমিক গোপন তথ্য, সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্টের তথ্য, ব্যক্তিগত ইমেইল তথ্য ইত্যাদি সংরক্ষিত থাকে। 

আইপি এড্রেস লুকিয়েই তবে ব্রাউজারে প্রবেশ করতে হয়। Image Source: dnaindia.com

ডার্ক ওয়েবে কীভাবে যাওয়া যায়? 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী (TOR) টর নামে একটি সফটওয়্যার তৈরি করে। যা দিয়ে এই ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করা যায়। পেঁয়াজের খোসার মতো পরতে পরতে পরিচয় লুকিয়ে এখানে প্রবেশ করা হয় বলে একে অনিয়ন সফটওয়্যারও বলা হয়ে থাকে। আপনি ইন্টারনেট ব্রাউজ করার সময লক্ষ্য করবেন যে ডার্ক ওয়েবসাইটের শেষে .com, .org, .edu ইত্যাদির পরিবর্তে .onion এক্সটেনশন দিয়ে শেষ হয়। একবার ইন্সটল করলে ব্রাউজারটিতে সাধারণ ব্রাউজারগুলির মতোই কাজ করা যায়।আপনার কম্পিউটার এবং ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ রাখতে টরে প্রবেশের আগে ভিপিএন ব্যবহার করতে পারেন। আর আপনি যে ওয়েবসাইটে ঢুকতে চান তার সঠিক লিংক যদি থাকে তাহলেই সেখানে ঢুকতে পারবেন। 

ডার্ক ওয়েবের সুবিধা এবং অসুবিধা

সুবিধা

ডার্ক ওয়েব মানুষকে তার গোপনীয়তা বজায় রাখতে এবং স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে সাহায্য করে। সরকার এবং অন্যান্য অপরাধীদের দ্বারা আতঙ্কিত অনেক নিরপরাধ লোকের জন্য গোপনীয়তা অপরিহার্য। এছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনার মতামত প্রকাশের জন্য করা পোস্টগুলি অনেক সময় দেশীয় আইনবিরোধী হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে এই ধরণের পোস্টও এই ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন। 

তাছাড়া, অপরাধীদের সাথে ডার্ক ওয়েবের সম্পর্ক থাকায় এটি পুলিশ অফিসারদের যোগাযোগের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য উপায় বলে বিবেচিত। এটি রাজনৈতিক হুইসল-ব্লোয়ার, অ্যাক্টিভিস্ট এবং সাংবাদিকদের দ্বারাও ব্যবহার করা হয়। যারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকার হতে পারে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এখানে উইকিলিকসের ওয়েবসাইটও রয়েছে।

অসুবিধা 

কিছু লোক অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত হয়ে ডার্ক ওয়েবের অপব্যবহার করে থাকে। এই জগতে অপরাধ করা আরো সহজ হয়ে গেছে ক্রিপ্টোকারেন্সির আগমনের পর থেকেই। কারণ, অবৈধ জিনিস কেনা বেচায় যখন অর্থের প্রয়োজন তখন কিন্তু কোনো ব্যাংকই পরিচয় ছাড়া অর্থ লেনদেন করতে দেবে না। ফলে পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সির আগমনের পূর্বেও। ২০০৮ সালে সেই আশঙ্কাটিই দূর হয়েছে কারণ ক্রিপ্টোকারেন্সি তখনই আবিষ্কার হয়। আর এটি অনলাইন মানি যা লেনদেনে কোন তথ্য প্রকাশ হয় না। 

এছাড়া, যদিও ডার্ক ওয়েব এর ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার প্রতিশ্রুতি দেয়, তবুও অন্যদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করাই এখানে অন্যতম কাজ। সারফেস ওয়েবে শেয়ার করা কারও ব্যক্তিগত ছবি, তথ্য, মেডিকেল রেকর্ড, আর্থিক তথ্য ইত্যাদি সবই চুরি বা হ্যাক করে এই ডার্ক ওয়েবে শেয়ার করা হয়েছে। এমনকি আপনার ব্যক্তিগত তথ্যও ডার্ক ওয়েবে পেতে পারেন। এখানে পন্য কেনাবেচায় করও প্রদান করা হয় না। তাই অপরাধীরা ঝুঁকিবিহীনভাবে তাদের অপরাধ চালিয়ে যেতে পারে। এর ব্যবহারকারীদের  সনাক্ত করা যায় না বলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষের পক্ষে ডার্ক ওয়েব সাইটগুলির মালিক এবং ব্যবহারকারীদের নির্ধারণ করা কঠিন। 

ডার্ক ওয়েবে আপনার প্রতিচ্ছবিও যেন দেখা না যায়। Image Source: kaspersky.com

ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করা কি বৈধ না অবৈধ?

এক কথায় ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করা অবৈধ নয় বরং বৈধ। যে কেউ এটা ব্যবহার করতে পারে যদি এই ওয়েবের একসেস থাকে তার কাছে। আর এই ওয়েবের যেসব ফিচার রয়েছে সেগুলো দিয়ে যদি কোন অবৈধ কাজ করা হয় তবেই তাকে অবৈধ বলা হবে। ইন্টারনেটের এই অন্ধকার জগতের মূল উদ্দেশ্য হলো পরিচয় গোপন করা। কিন্তু এই গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে যারা এই জগতে খারাপ কাজ করে বেড়াচ্ছে তাদের জন্যই এই জগতকে অপরাধের জগত বলা হয়।

এখানে যে কেবল অপরাধই সংঘটিত হয় তা নয়; বরং এখানে ভালো বা বৈধ কাজও হয়ে থাকে। যেসব কাজ আইনের চোখে অবৈধ কিন্তু জনকল্যাণমুলক সেই ধরণের অনেক কাজ এখানে করা হয়। এজন্য বিশ্বের অনেক বড় বড় কোম্পানির ওয়েবসাইট আছে এই ডার্ক ওয়েবে। তারা তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করতে এই ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে যা অবৈধ নয়। যেমন ফেসবুক, নিউইয়র্ক টাইমস, সিআইএ প্রভৃতি ওয়েবসাইটও এই ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে। 

ডার্ক ওয়েবে সবসময় অপরাধীরা, হ্যাকাররা ঘোরাফেরা করে বিধায় এখানে খুব সাবধানে প্রবেশ করা উচিত। কারণ আপনার তথ্য হ্যাক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এজন্য টর ব্রাউজার দিয়ে এখানে প্রবেশের আগে ভিপিএন ব্যবহার করুন। আর যারা সাধারণ মানুষ তারা এখানে প্রবেশ না করাই ভালো। কারণ, পান থেকে চুন খসলে তথ্য পাচার হবার সম্ভাবনা রয়েছে। 

আর এই ওয়েবে যদি ঢুকেও যান তাহলেও কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এখান থেকে কিছু ডাউনলোড বা কেনাকাটা না করাই উচিত। যদিও বই বা গান (যেগুলো সারফেস ওয়েবে পাওয়া যায় না) ডাউনলোড করলেও কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু ভুলেও অস্ত্র বা ড্রাগ বা কোনো বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়া যাবে না। কারণ, গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা অপরাধীদের নামে ফেক আইডি খুলে এই সব ওয়েবসাইটগুলিতে নজর রাখার চেষ্টা ক‍রে। 

ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে হয় সন্তর্পনে। Image Source: shutterstock.com

আপনার তথ্য ডার্ক ওয়েবে আছে কিনা তা আপনি কীভাবে জানবেন? 

আগেও বলেছি ডার্ক ওয়েবে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ব্যাঙ্কিং, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইমেল অ্যাকাউন্ট, আপনার সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর বিক্রি হতে পারে। আপনি যদি জানতে চান যে আপনার কোনো তথ্য ডার্ক ওয়েবে পাওয়া যাচ্ছে কিনা, তাহলে ডার্ক ওয়েবে একটি স্ক্যান চালানোর মাধ্যমে তা জানতে পারেন। আপনাকে এজন্য এখানে ডার্ক ওয়েব মনিটরিং পরিষেবার জন্য সাইন আপ করতে হবে। যখনই তারা আপনার কোনো তথ্য খুঁজে পাবে তখন এই টুলসগুলি আপনাকে সতর্ক করে দেবে। 

আপনার তথ্য ডার্ক ওয়েবে থাকলে আপনি কী করবেন?

সারফেস ওয়েবে আপনার তথ্য সুরক্ষিত রাখতে আপনি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন। প্রথমে আপনাকে সমস্ত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করতে হবে, আপনার সমস্ত আর্থিক ও ব্যাংক হিসাব পরীক্ষা করুন এবং আপনার ব্যাংক কে জানান। আপনি আপনার ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংক একাউন্টকে সুরক্ষিত রাখতে এটিকে ফ্রিজ করতে পারেন। এছাড়া, এমন ধরণের ব্যাক্তিগত মুহুর্তের ছবি শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন যা দিয়ে কেউ আপনার মানহানি বা ক্ষতি করতে পারে।

শেষ কথা

ডার্ক ওয়েবকে অনেকে নতুন ধারণা মনে করলেও এটি মূলত অনেক পুরনো ধারণা। অপরাধীরা ইন্টারনেট সৃষ্টির শুরু থেকেই ডার্ক ওয়েব ব্যবহার তথা অপব্যবহার করে আসছে। অবশ্য এটাকে ভালো কাজেও ব্যবহার করা হয়। তাই বলা যায় ডার্ক ওয়েব নিজে অন্ধকার নয়, একে অন্ধকার জগতের কাজে ব্যবহার করা হয়। মূলত ব্যবহারকারীর কাজের ভিত্তিতে এর ভালোমন্দ নির্ভর করে। 

 

Feature Image: techadvisor.com
তথ্যসূত্র:

01. The dark side of the Internet.
02. True stories from the dark side of the Internet.
03. What’s the Difference Between the Deep Web and the Dark Web?
04. The Dark Side of the Internet.

 

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
নুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!