ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার: ব্রাজিলকে বুকে ধারণ করা যিশুর ভাস্কর্য

47
0

ব্রাজিলের দক্ষিণে রিও ডি জেনেরিও শহরে ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার ভাষ্কর্যটি অবস্থিত। ব্রাজিলের প্রিন্সিপাল পোর্ট সিটিতে বিভিন্ন জনপ্রিয় এবং আঞ্চলিক গানের মাধ্যমে রিও ডি জেনেরিও কর্কোবাদো টাওয়ারে উৎযাপনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত।  

ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের এই স্ট্যাচুটি ১৯৩১ সালে নির্মাণ করা হয়। এটি উচ্চতায় ৯৮ ফিট, আর এর বাহুর প্রশস্ত প্রায় ৯২ ফিট। পুরো ব্রাজিলের এবং রিও ডি জেনেরিও শহরের একটি ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে সময়ের সাথে সাথে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এই দৃষ্টিনন্দন ভাষ্কর্যটি।  

ভাষ্কর্যটির মেঝে তৈরির জন্য রেইনফোর্সের কংক্রিট ক্লেড এর সাথে সহস্র মোজাইকের ট্রেগুলার সোপ-স্টোন টাইলসের সাথে স্কয়ার আকৃতির স্টোন ব্যবহার করা হয়েছে। যার আকার প্রায় ২৬ ফিট চওড়া। এই স্থাপনা এতটাই মজবুত যে, সমুদ্রপৃষ্ঠ এটি অনেক উচ্চতাও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। স্থাপত্যকলায় সর্ববৃহৎ স্থাপনা হিসেবে সারা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হলো এই ভাষ্কর্যটি। 

ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। Image Source: pinterest.com

ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির উচ্চতা ১২৫ ফিট। এর পাদদেশে প্রার্থনার জন্য ছোট ছোট চ্যাপেল রয়েছে। অসাধারণ এই স্থাপনাটি নির্মাণ করতে প্রায় সাড়ে ৫ বছর সময় লেগেছে। সাড়ে পাঁচ বছর কাজ শেষে ১৯৩১ সালের ১২ অক্টোবর এই স্থাপনাটি উদ্বোধন করা হয়। সময়ের কথা চিন্তা করলে স্থাপনাটি বেশ পুরনো। 

কিন্তু সময়ের কাল-গর্ভে আজও একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে স্থাপত্যকলার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে এই স্থাপনাটি। কেন ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার সেরা তার পেছনে কিছু অজানা কারণ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক –

আকার এবং আয়তন 

ক্রাইস্ট মূলত এক ধরনের মানব মূর্তি। পুরোপুরি মানব আকৃতি সম্বলিত বিশালাকার মানব-মূর্তি হিসেবে দণ্ডায়মান। হঠাৎ করে আপনি তাকালে হয়তো মনে হতেই পারে যে, এই মূর্তিটি হয়তো আকাশ ছুঁয়ে নিজের বীরত্ব প্রকাশ করছে। এই ভাষ্কর্যটির গঠনে মানব অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হলেও এটির উচ্চতা অনেক বেশি প্রদান করা হয়েছে।

প্রাচীন গ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিকেরা আকার কিংবা আয়তন হিসাবের উপর নির্ভর করে বিশ্বব্যাপী সকল অসাধারণ স্থাপনা তৈরি করতেন। এই স্থাপনাটির মানব-মূর্তির নকশা প্রদানের জন্য এবং অসাধারণ জিও-ম্যাট্রিক দর্শনের জন্য জনপ্রিয়তা লাভ করেছে সকলের কাছে। 

 এছাড়াও, এই স্থাপনার জন্য বৃত্তাকার এবং চারকোনা আকৃতির আউট-স্কেচ তৈরির জন্য মার্কস ভুট্রুভিয়াস পরিচিত হয়েছেন। যীশু ক্রিষ্টের জন্মের ঠিক পূর্বে তিনি মানব মূর্তির স্থাপনা ধারণা প্রদান করেছিলেন। এই মতবাদটি তিনি ক্রিস্টিয়ান ল্যাটিনের উপর ভর করে প্রদান করলেও প্রাচীন গ্রিকরা এটি পুরোপুরিভাবে বিনির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন।  

ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার দেখতে আসে প্রতিনিয়ত অসংখ্য পর্যটক। Image Source: pinterest.com

 

নান্দনিকতা শৈলী 

সৃষ্টিশীল ডিজাইন এবং অসাধারণ স্থাপত্যকলার জন্য এই ভাষ্কর্যটি সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর বাইরের আউটলুকটি ল্যাটিন সভ্যতার ধর্মের উপর বিশ্বাস এবং ক্রিস্টানি আইকোনাগ্রাফির উপর বিশ্বাস প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে ব্যাখ্যা প্রদান করে। মূলত এই স্থাপনাটি বিনির্মাণে স্থাপত্য শিল্পীদের বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। যেমন –  

  • পর্যাপ্ত পরিমাণ আলোর ব্যবহার 
  • সূর্য এবং আলোর পরিপূর্ণ রিফ্লেকশন 
  • চাঁদ এবং তার আলোর রিফ্লেকশন
  • কালার কমপ্লিকেশানসহ আরও নানান চ্যালেঞ্জ  

কিন্তু সকলের অক্লান্ত পরিশ্রমে তারা খুব ভালোভাবে এই বাঁধা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। আপনি যদি এই ভাস্কর্যটির অতীত ইতিহাস সম্পর্কে না জেনে থাকেন তাহলে এই স্থাপনাটির সাথে অবস্থিত ইতিহাস এর বিবরণ আপনাকে অতীত ইতিহাস সম্পর্কে যেমন জানান দিবে ঠিক তেমনি করে আপনাকে পুরনো দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। এই স্ট্যাচুটি ধর্মীয় অনুভূতিকে লালন করে আধুনিক সভ্যতার এক অন্যতম নিদর্শন হিসেবে দণ্ডায়মান একটি স্থাপত্যশিল্প বলা চলে। 

ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। Image Source: pinterest.com

 

প্রকৌশল বিদ্যা এবং সংরক্ষণ

প্রকৌশল বিদ্যার বড় বড় নিদর্শন আমরা সারা বিশ্বব্যাপী অবস্থিত বড় বড় স্থাপনায় দেখতে পাই। বড় বড় শহর যেমন নিউ ইয়র্ক, শিকাগো এই সকল শহরে আমরা এই সকল বিল্ডিং খুব সহজে চোখে পরে। ১৯২৬ সালের দিকে এই স্ট্যাচুটি পাদদেশের ধর্মীয় স্থাপনার কাজ শুরু হয়। পাদদেশের মজবুত স্থাপনার উপর ভিত্তি করে স্ট্যাচুটির বাকি কাজ চলমান থাকে। স্টিলকে রেইনফোর্স কংক্রিটে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে এই স্থাপনার সাথে যুক্ত শ্রমিকদের রেলপথে বড় বড় পাহাড় পারি দিতে হয়েছিল।  

সকলের নিরলস পরিশ্রমের ফলে এবং প্রকৌশলীদের রাতদিন অসামান্য পরিশ্রমের কল্যাণে বর্তমান সভ্যতার একটি জনপ্রিয় স্থাপনা হিসেবে সারা বিশ্বব্যাপী বেশ জনপ্রিয় এবং প্রচলিত। ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার স্থাপনাটির প্রতিটি হাতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০.৫ ফিট। এই স্থাপনা বিনির্মাণে প্রায় হাজার হাজার ত্রিভুজাকৃতির স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে। এই স্থাপনাটি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তার শৈলী, পরিপূর্ণরূপে আলোর সংমিশ্রণ এবং অসাধারণ দর্শনের জন্য বেশ জনপ্রিয়। 

এই জনপ্রিয় স্থাপনাটি ১৯৩১ সালে নির্মাণ কার্য সম্পন্ন করে। কিন্তু ডিজাইনার পরবর্তীতে এর দরজায় এবং নিম্নভাগে ডিজাইনিং এর জন্য অনেক কাজ করে। আর তাই এই স্থাপনাটি পরিষ্কারের জন্য বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয়। সেই কথা মাথায় রেখে এই স্থাপনাটি পরিষ্কারের জন্য দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ক্রেচারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়ে টাইলস পরিষ্কার করার জন্য। 

ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের পায়ের মূর্তি। Image Source: pinterest.com

স্থাপত্যের নিদর্শন 

এই স্থাপনাটির অসাধারণ স্থাপত্যকলার জন্য এই ভাষ্কর্যটি সারা বিশ্বব্যাপী বহুল পরিচিত এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। যা নিউ ইয়র্কের স্টক এক্সচেঞ্জের সুপ্রিম কোর্টের ওয়েস্টার্ন পার্লামেন্টের আয়োজিত জরিপে প্রকাশ করা হয়েছে। এই স্ট্যাচুটির মাধ্যমে মানুষের কাজ এবং তার জীবন নিদর্শন খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। যেমনটা করা ওয়াশিংটনে অবস্থিত মার্কিন লুথার কিংয়ের মেমোরিয়াল এর মধ্যে। 

ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত স্থাপনাটির বহু অর্থ থাকলেও ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার তার ব্যতিক্রম নয়। যেমন স্থাপনাটির চূড়ায় এক ধরণের প্রতীক দেখতে পাওয়া যায়; যা ধর্মীয় মতবাদের আলোকে তৈরি করা হয়েছে। এই চিহ্নটি দ্বারা স্থাপনাটির স্থপতিরা তা ইশ্বরের আলো, ঈশ্বরের প্রেম এবং ঈশ্বরের মহানুভবতাকে আলোকপাত করে। কিন্তু খ্রিস্টান ধর্মালম্বলীদের কাছে এই স্থাপনাটি যিশু খ্রিস্টের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এই স্থাপনাটি দ্বারা সারা বিশ্বকে জানান দেওয়া হয় যে রিও ডি জেনেরিও একটি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের শহর। 

রক্ষণাবেক্ষণে স্থাপত্যকলা 

কেন এটি সেরা? অন্যান্য বিল্ডিংয়ের মতো এই বিল্ডিংটি যে স্থানটিতে অবস্থিত সেই স্থানের পরিচিত খুব প্রভাব বিস্তার করেছে। স্থানীয়দের ধারণা যে, এই প্রতীকটি তাদের ঈশ্বরের কাছে প্রতীক হিসেবে বিবেচনাধীন রয়েছে। যীশু খ্রিস্টের মতো এই স্ট্যাচুটি স্থানীয়দের কাছে একটি ছাদের মতো যা তাদের ছায়া দিয়ে আগলে রাখে। একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার সবচেয়ে বেশি পরিচিত এবং জনপ্রিয়। কারণ এই স্থাপনাটি অনেকের কাছে রক্ষাকর্তা হিসেবে কাজ করে। 

ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার স্ট্যাচুটি ব্রাজিলের ইঞ্জিনিয়ার এবং আর্কিটেকচার হেইটোৰ দ্য সিলভা কস্তা ডিজাইন করেছেন। তিনি জুলাইয়ের ২৬ তারিখে ১৮৭৩ সালের দিকে রিও ডি জেনেরিওতে জন্মগ্রহণ করেছেন। দ্য সিলভা কস্তা ১৯২২ সালের দিকে এই স্ট্যাচুটির নকশা ডিজাইন করেছেন। তিনি তার যোগ্যতা এবং দক্ষতার উপর ভিত্তি করে স্ট্যাচু ডিজাইন প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেছেন। কিন্তু কিছু দিক বিবেচনা করে জনপ্রিয় আর্টিস্ট কার্লোস অসোয়ালিদ তার এই স্কেচে তাকে সাহায্য করেছেন। 

এছাড়াও, ফরাসির একজন জনপ্রিয় ডিজাইনার পাউল ল্যান্ডবাসকি আলাদাভাবে তার স্টুডিওতে বসে এই স্ট্যাচুটির হাত এবং মাথার নকশা করেন। কারণ এমনভাবে ডিজাইনটি প্রস্তুত করার জন্য বলা হয়েছে যার থেকে প্রাপ্ত ফলাফল ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে। এছাড়াও, কনস্ট্রাকশন খাতে ফ্রান্স আলবার্ট কাকিউট পরিপূর্ণ দিক নির্দেশনা প্রদান করে। 

ভাবতেই খুব অবাক লাগে যে, এই অসামান্য স্থাপনাটির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কতশত মানুষ নিরলসভাবে কাজ করে গিয়েছেন। আর হয়তো সকলের নিরলস পরিশ্রম ঐকান্ত চেষ্টা এবং মিলিত পরিশ্রমের কারণে এই স্থাপনাটি সারা বিশ্বে এতটাই জনপ্রিয়। কারণ এই স্থাপনাটি এতটাই বিশাল যা কখনো একজন ব্যক্তির পক্ষে করা সম্ভব নয়। কারণ এটি তাদের ধর্মের এবং দেশের ঐতিহ্য হিসেবে বিদ্যমান। 

Feature Image: pinterest.com 
References: 

01. 5 Ways Cristo Redentor Is Iconic. 
02. Christ the Redeemer. 
03. CHRIST THE REDEEMER.

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
নুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!