মান্ধাতার আমল- পুরাণ থেকে প্রবচন

179
0

কথার পিঠে কথা বা প্রবাদ ব্যবহার করে কথা বলা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সকল দেশে সকল যুগে এবং কালে এর প্রচলন ছিল, আছে এবং থাকবে। মুখে মুখে ফেরার কারণে অতি সাধারণ বিষয়ও কিংবদন্তিতে রূপ নেয়। এরূপ উদাহরণ বাংলাতেই ভুঁড়ি ভুঁড়ি আছে। ‘মান্ধাতার আমল’ ঠিক তেমনই একটি উদাহরণ।

নিগূঢ় অর্থ বিশ্লেষণের আগে আভিধানিক অর্থ তলিয়ে দেখা যাক। মান্ধাতা বলতে সাধারণত প্রাচীন কোনো কাল বা সময়কে নির্দেশ করে। কথা বলার সময় ‘মান্ধাতার আমল’ এই প্রবচনটির ব্যবহার বহুল প্রচলিত।

মান্ধাতা একটি পৌরাণিক চরিত্র। বিষ্ণুপুরাণে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের বনপর্ব, দ্রোণপর্ব এবং শান্তিপর্বে তার অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। তিনি সত্যযুগে সূর্যবংশের রাজা ছিলেন। এই বংশ থেকেই বহুকাল পরে রামের জন্ম হয়। যে সময়ে রাজা মান্ধাতা বিচরণ করতেন, সময়ের হিসেবে সেটি ৩৫ লক্ষ বছরেরও আগে!

তার জন্মলাভের ঘটনাও অভূতপূর্ব। মাতৃগর্ভের বদলে তার জন্ম হয়েছিল পিতৃগর্ভে। তখন অযোধ্যার রাজা ছিলেন ইক্ষ্বাকু বংশোদ্ভূত যুবনাশ্ব। তার জীবনে কোনো কিছুর অপূর্ণতা ছিল না। কেবল একটি জায়গায়ই তিনি অভাবী ছিলেন। তার কোনো সন্তান ছিল না। সন্তান লাভের জন্য এমন কিছুই নেই যা তিনি করেননি। এমনকি অশ্বমেধ যজ্ঞও করেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু না হওয়ায় মনের দুঃখে তিনি গৃহত্যাগী হন এবং জঙ্গলে গমন করেন। শুরু হয় তার কঠিন তপস্যা। তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে মুনিরা যজ্ঞ করে তার জন্য মন্ত্রপূত জল রেখে দেন। যা পান করলে যুবনাশ্বের রাণী সন্তান লাভ করতে পারবে। তপস্যার এক পর্যায়ে প্রবল তৃষ্ণায় তিনি যজ্ঞবেদীর উপর রাখা পাত্র দেখে সেখান থেকেই পান করে নেন। কিন্তু এটিই ছিল রাজার স্ত্রীর জন্য রাখা মন্ত্রপূত জল। যেহেতু রাজাই পান করে ফেলেছে, তাই স্ত্রীর বদলে তাকেই গর্ভধারণ করতে হবে বলে ঘোষণা দেন মুনিরা।

এই ঘটনার ১০০ বছর পর রাজা যুবনাশ্বের পেটের বাঁ দিক কেটে বের করা হয় এক পুত্রসন্তান। তাকে দেখতে আসেন স্বয়ং দেবরাজ। মান্ধাতা দুধের জন্য কাঁদলে তিনি নিজের তর্জনী আঙুল সদ্যজাত শিশুর মুখে তুলে ধরেন এবং বলেন ‘মাম ধাস্যতি’। অর্থাৎ ‘আমাকে পান করো। এই থেকেই তার নাম রাখা হয় মাম-ধাতা বা মান্ধাতা। ইন্দ্রের এই আঙুল ছিল অমৃতক্ষরা। যার ফলে মান্ধাতা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বড় হয়ে যায়। মাত্র ১২ দিনেই ১২ বছরের পরিপূর্ণতা পায় সে। হয়ে ওঠে সর্বগুণে গুণান্বিত। চতুর্বেদ ও যু্দ্ধ শাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠে। তার বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল। অবশ্য এর পেছনেও ছিল কঠোর তপস্যা। স্বয়ং শিবের ধনুক এবং স্বর্গীয় তীর ছিল তার যুদ্ধ সঙ্গী। পিতা যুবনাশ্বের মৃত্যুর পর তিনি রাজা হন। কিছুকালের ভেতর তার নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।

মহাভারতে উল্লেখ আছে, রাজা মান্ধাতা বিশাল এক স্বর্ণের তৈরি রোহিত মৎস্যের মূর্তি ব্রাহ্মণদের কল্যাণার্থে দান করেন। এছাড়া ১০০০ উৎকৃষ্ট মানের গাভীও উৎসর্গ করেন। তিনি তার জীবদ্দশায় ১০০ অশ্বমেধ যজ্ঞ ও ১০০ রাজসূয় যজ্ঞ সম্পন্ন করেন। তিনি লংকার রাজা রাবণের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেন। তবে সুমেরু পর্বতে সংঘটিত এই যুদ্ধে তিনি রাবণকে হারাতে পারেননি। কেউ কারো চেয়ে কম ছিলেন না। অবশেষে একটা মীমাংসায় আসতে তাকে রাবণের সঙ্গে সন্ধি করতে হয়েছিল।

তিনি বিয়ে করেন চন্দ্রবংশীয় রাজকন্যা যাদব রাজা শশধরের কন্যা বিন্দুমতিকে। তাদের ছিল তিন পুত্র- পুরুকুৎস, অম্বরীশ, মুচুকুন্দ। আর পঞ্চাশজন কন্যা। কন্যারা রূপে গুণে অনন্য ছিলেন। তাদের সকলেই সৌভরি মুনির প্রেমে পড়েন এবং তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই ঘটনাও কম চমকপ্রদ নয়।

সৌভরি মুনি দীর্ঘকাল জলের তলায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন। অতঃপর তার মনে সংসারী হওয়ার বাসনা জাগে। তিনি সরাসরি চলে যান রাজা মান্ধাতার কাছে। তার একটি কন্যা তাকে দান করতে বলেন। জরাগ্রস্থ মুনিকে কন্যাদানে রাজার মত না থাকলেও অভিশাপের ভয়ে তিনি বারণ করতে পারেন না। মুনি তার মনোভাব বুঝতে পেরে তাকে একটি প্রস্তাব করেন। মুনি রাজার কন্যাদের সঙ্গে দেখা করবেন। কেউ যদি তাকে পছন্দ করে তাহলে তিনি বিয়ে করবেন, অন্যথায় ফিরে যাবেন। অতঃপর তিনি দিব্যরূপ ধারণ করে কন্যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে সকলেই তাকে বিয়ে করতে উন্মুখ হয়ে পড়ে। মুনি প্রসন্ন মনে সকলকে নিয়ে প্রস্থান করেন এবং সকলের জন্যই আলাদা প্রাসাদ তৈরি করে দেন। এর কিছুকাল পরে রাজা মেয়েরা কেমন আছে তা দেখতে যান। গিয়ে দেখেন সবাই সুখে আছে। কারো কোনো অভিযোগ নেই। রাজা মেয়েদের সুখী দেখে নিশ্চিন্ত মনে ফিরে যান।

বৌদ্ধদের শাস্ত্রেও তিনি একজন প্রভাবশালী রাজা হিসেবে পরিচিত। তার প্রতিপত্তির অনুরাগী হয়ে বহু রাজা তাদের নিজ রাজ্য মান্ধাতাকে শাসনের জন্য হস্তান্তর করেন বলে এই শাস্ত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।

মান্ধাতা পুরুষ গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন এবং পুরুষের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন বলে তাকে অতিমানবীয় পুরুষ হিসেবে তান্ত্রিক শাস্ত্রে গণ্য করা হয় এবং মূল্য দেওয়া হয়। এই জন্যই হয়তো পরবর্তীতে হিন্দুশাস্ত্রে শিবের সাথে তার যোগসূত্র দেখানো হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রদেশ এবং উড়িষ্যার শিবমন্দিরগুলোতে রাজা মান্ধাতার যোগসূত্র রয়েছে। মান্ধাতার গল্প চিত্রিত আছে অন্ধ্রপ্রদেশের গোদাবরীর ব-দ্বীপ অঞ্চল অমরাবতীতে। মান্ধাতার গল্প বণিক ও রাজাদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ছিল। এই গল্প পরিচিত ছিল ‘শক্তি উপাখ্যান’ নামে। অর্থাৎ মান্ধাতাকে কিংবদন্তীতে পরিণত করেছিল তার কর্মযজ্ঞ।

পুরাণ মতে তিনি একদিনে মর্ত্যলোক জয় করেন। অধিকার করেন পাতালপুরী এবং স্বর্গলোকের অর্ধাংশ। কিন্তু স্বর্গলোক অধিকারকালে তাকে বাধা প্রদান করেন ইন্দ্র। তিনি তাকে স্মরণ করিয়ে দেন, সকলকে হারাতে পারলেও মধুপুত্র লবণাসুরকে এখনও তিনি বধ করতে পারেননি। এতে রাজা লজ্জিত হন এবং ফিরে গিয়ে লবণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। লবণাসুরের পিতা মধুর ছিল স্বয়ং শিবের দেয়া মন্ত্রপূত ত্রিশূল। এটি শত্রুকে বধ করে আবার তার কাছে ফিরে আসত। এতই ছিল তার ক্ষমতা। তিনি শিবের কাছ থেকে বর চেয়েছিলেন এটি যেন বংশপরম্পরায় তার উত্তরাধিকাররা ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু শিব শুধু লবণাসুরকেই এই অনুমতি দেন। রাবণের সাথে যুদ্ধে মধু নিহত হন। আর এদিকে রাজা মান্ধাতা লবণাসুরের কাছে পরাজিত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন। যদিও তার মৃত্যু নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।

এর বহুকাল পরে এই বংশেই জন্ম হয় রামের। যার হাতে বিনাশ হয় লংকার রাজা রাবণের। রাম হন জগদ্বিখ্যাত। অথচ রামের বংশের বীরত্ব গাঁথা আদি উপাখ্যান জানে খুব কম লোকেই। রাজা মান্ধাতা বীর হিসেবে সর্বজনবিদিত না হলেও তিনি টিকে আছেন মানুষের দৈনন্দিন আলাপচারিতায়, প্রবচনে। পুরাণ থেকে প্রবচন সকল জায়গায় তার রাজত্ব। হোক সেটা নিভৃতে, তবুও তিনি আছেন, তিনি থাকবেন। পৌরাণিক চরিত্রদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অথচ নিভৃতচারী হলেন রাজা মান্ধাতা।

Feature Image: https://in.pinterest.com/pin/1093952565707639692/

Reference:

1. https://dailyasianage.com/news/282643/the-tale-of-king-mandhata–and-his-era

2. https://www.mid-day.com/news/opinion/article/mandhata-the-ancient-king-23247356

3. https://starofmysore.com/mandhata-the-ancient-king/amp/