ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আলোচিত কেলেঙ্কারি

230
0

ওয়াটারগেট একটি হোটেলের নাম যা ১৯৭২ এবং ১৯৭৪ সালের মধ্যে রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির একটি জটিল ঘটনাকে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহার করা হয়। মূলত শব্দটি বিশেষভাবে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ওয়াটারগেট হোটেলকে বুঝায়। 

ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল মার্কিন প্রেসের প্রশাসনের একটি রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল। রিচার্ড এম. নিক্সন ১৯৭২ সালের ১৭ জুন ওয়াটারগেট অফিস-অ্যাপার্টমেন্ট-হোটেল কমপ্লেক্সে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির সদর দপ্তরে পাঁচজন চোরকে গ্রেপ্তার করার পরে ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল প্রকাশ করা হয়েছিল। 

আর এই সমস্ত স্ক্যান্ডালকে ধামাচাপা দেওয়ার কারণে ৯ আগষ্ট ১৯৭৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন পদত্যাগ করেন। নিক্সন-ই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি পদত্যাগ করেছিলেন। আর আজকের আয়োজনের বিস্তারিত সাজানো হয়েছে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির বিস্তারিত বিষয়কে কেন্দ্র করে। 

ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডেলের চুরি, গ্রেফতার এবং রাজনৈতিক প্রভাব 

১৯৭২ সালের ১৭ জুন এর প্রথম দিকে পুলিশ ওয়াটারগেট কমপ্লেক্সে ডিএনসি অফিসে পাঁচজন চোরকে আটক করে। তাদের মধ্যে চার জনই ছিল পূর্বে কুবায় ফিদেল কাস্ত্রোর সেন্ট্রাল এজেন্সির কর্মকর্তা, এবং পঞ্চম জন ছিলেন জেমস ডব্লিউ ম্যাককর্ড, যিনি পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ে প্রধান নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন।  

পরেরদিন সকালে ওয়াশিংটন পোস্টে কার্ল বার্ন্সটাইন এবং বব উডওয়ার্ড দুজন তরুণ সাংবাদিক প্রেপ্তারের প্রসঙ্গে লিখলে তাদেরকে অস্বাভাবিক মারধোরের স্বীকার হতে হয়েছিল। অতঃপর সাংবাদিকেরা এফবিআই-এর নিকট ২ জন চোর ষড়যন্ত্রকারীকে চিহ্নিত করেছিলেন। এবং এটাও উল্লেখ করেন যে, তাদের কাছে আড়ি পাতার যন্ত্র ছিল পরে সেগুলো উদ্ধার করা হয়। 

কার্ল বার্ন্সটাইন এবং বব উডওয়ার্ড। Image Source: inewsource.org

আর এটি প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পূর্বনির্বাচনের প্রচারনার বড় ধাক্কা দেয় এবং ওয়াশিংটন পোষ্টে আরো উল্লেখ করা ছিল যে, ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডেলের পেছনে নিক্সনের পুর্বনির্বাচন কমিটির সদস্য এবং সিআরএর সাবেক সদস্য জেমস ম্যাককর্ডের নাম ও সম্পৃক্ততা। 

তরুণ সাংবাদিকেরা আরো দারি করেন, এই ঘটনার পেছনে হোয়াইট হাউসেরও হাত রয়েছে। তবে এই প্রঙ্গনে প্রশ্ন উঠলে সেই সময়ে ২২ জুন নিক্সন তা অস্বীকার করেন। কিন্তু এতে কোন লাভই হয় না সেই দুই তরুন সাংবাদিকের প্রতিবেদনের মধ্যে দিয়ে এবং এফবিআই-এর অনুসন্ধানে সকল তথ্য বেরিয়ে আসে এবং সেটির কারণে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭৪ সালে অভিশংসনের মুখোমুখি হোন। 

প্রেসিডেন্ট নিক্সন তখন তার দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেই সময়ে তার নির্বাচন কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রতিপক্ষ ডেমোক্রেটিক পার্টির খবর পাওয়ার জন্য ওয়াশিংটন ডিসির ওয়াটারগেট হোটেলে অবস্থিত দলটির সদর দপ্তরে গোপনে টেপ রেকর্ডার স্থাপন করেছিলেন। ঘটনাটি ফাঁস হওয়ার পরে হোয়াইট হাউসের কয়রকজন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন এবং একজনকে বরখাস্ত করা হয়। 

ওয়াটার গেট ট্রায়াল এবং ফলাফল 

নিক্সনের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিষেক হবার দুই সপ্তাহের পূর্বেই ফেডারেল আদালত প্রেপ্তার হওয়া পাঁচ জন এবং দুই সহযোগীর বিচার শুরু করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে চুরি, যড়াযন্ত্র এবং ফেডারেল ওয়ারট্যাপিং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল। লিডি এবং ম্যাককর্ড ব্যতীত সমস্ত আসামী সেদিন দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল, যারা জানুয়ারীর শেষে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল তাদের সাজা সুনানির জন্য আদালতে ২৩ মার্চ পুনরায় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।  

ওয়াটারগেট ট্রায়ালের তৃতীয় শুনানির দিনে তোলা একটি ছবি। Image Source: George Tames/The New York Times

মার্চের শুরুতে এফবিআই-এর প্রধান হিসেবে নিক্সনের মনোনীত প্রার্থী এল. প্যাট্রিক গে-র সিনেটের নিশ্চিতকরণ শুনানির সময়ে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, হোয়াইট হাউসের একজন স্বল্প-পরিচিত আইনি সহায়ককে এফবিআই-এর ওয়াটারগেট তদন্তে ব্যক্তিগত অ্যাক্সেস দেওয়া হয়েছিল। এবং এটাও বলা হয়েছিল যে, যদি রাষ্ট্রপতি যদি চাপ দেন তাহলে নিক্সনের সহযোগীদেরও সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হবে এবং সেই সাথে তাদের বিরুদ্ধে প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হবে।  

 ১৯৭৪ সালের এপ্রিলের দিকে চাপের মুখে পরে যান প্রসিডেন্ট নিক্সন এবং সেই কারণে তিনি একপ্রকার বাধ্য হয়েই কিছু সংখ্যক টেপ প্রকাশ করেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সন জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সেই টেপগুলো হস্তান্তর করেন, এবং একইসাথে তিনি এটার স্বীকার করেন যে, তিনি আড়ি পাতা সম্পর্কে জানতেন। এমনকি এফবিআই-এর তদন্তে তিনি বাধা প্রদান করেছিলেন। 

আর এই সকল কারণে আগষ্টের দিকে সকল সাক্ষ্য এবং জনমত চলে যায় প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিপক্ষে এবং শুরু হয় সাংবিধানিক সংকট। সেই সময়ে কংগ্রেসের একটা বড় অংশ নিক্সনের বিরুদ্ধে চলে গেছিল। আর এই অবস্থার কারণে, কংগ্রেসের শুনানি এড়াতে ১৯৭৪ সালের ৮ই আগষ্ট পদত্যাগের ঘোষনা দেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। 

অভিসংশনের দায়ে অভিযুক্ত নিক্সনের বিরুদ্ধে জঙ্গণের আন্দোলন। Image Source: historytoday.com

ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডালের ক্ষমা প্রদান 

১৯৭৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, মার্কিন নতুন রাষ্ট্রপতি জেরাল্ড ফোর্ড নিক্সনকে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তার সমস্ত অপরাধের জন্য সম্পুর্ন এবং নিঃর্শত ক্ষমা প্রদান করেছিলেন। তবে ক্ষমার করার আগ অবধি অধিকাংশ আমেরিকানরা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, নিক্সন ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল অপরাধের জন্য দোষী এবং ফোর্ড তাকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য কুউড প্রোকুইও হিসেবে ক্ষমা করেছিলেন। অন্যথায় ফোর্ডের জনপ্রিয়তার রেটিং রাতারাতি ভেঙে পড়তো। 

নতুন চিফ এক্সিকিউটিভের প্রতি বিশ্বাসের এই ক্ষতিটি প্রায় ২৭ মাসের থেকেও বেশি সময় অবধি স্থায়ী হয়েছিল এবং জাতীয় মেজাজকে একটি কেলেঙ্কারি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তবে এই ঘটনার কারণে নিক্সনের ক্ষমা হলেও নিক্সনের নিকটতম সহযোগীদের একটি ক্লাচ অবশেষে জেলে গিয়েছিল। 

তবে ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি পদে রোনাল্ড রিগ্যানের আসার পরে তার বাগ্মীতার কারণে ওয়াটারগেটের প্রসঙ্গ আবার সামনে আসে যদিও এর প্রধান কারণ ছিল ভিয়েতনামের সাথে যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের ব্যর্থতা। 

নিক্সনের মৃত্যুর পরে ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডালের সময়ের রেকর্ডিং করা টেপগুলো ধ্বংস করার জন্য তার পরিবার আইনি সহয়তা নেয় এবং অনেক অর্থ ব্যয় করে। কিন্তু তারপরেও সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং হোয়াইট হাউসের পুরো টেপ রের্কডটি অবশেষে জনসাধারণের কাছে উন্মোচিত হয়। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগপত্র। Image Source: wikimedia.commons

১৯৭২ সালের ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আলোচিত একটি ঘটনা। প্রতি বছরের ১৭ জুন এই স্ক্যান্ডালের বিষয়টি সামনে আসে। এমনকি এই ঘটনার কারণেই মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম রাজনৈতিক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পদত্যাগ করেছিলেন।

আর তাই এই স্ক্যান্ডালের ৫০ বছরের বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও এই স্ক্যান্ডাল নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং আমেরিকার বিভিন্ন গনমাধ্যম এখনো এটা নিয়ে প্রতিবেদনের মাধ্যমে ঐ সময়ের ঘটনা তুলে ধরে। যদি একনজরে দেখা যায় সমস্ত ঘটনাকে তাহলে: 

  • ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম. নিক্সনের প্রশাসনের রাজনৈতিক স্ক্যান্ডালের একটি সিরিজ যেটা ১৭ জুন ১৯৭২ সালে ওয়াশিংনটন ডিসি-তে ওয়াটারগেট কমপ্লেক্সে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির একটি ঘটনা।
  • ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডালের চার চোর ছিল সিআইএ সংস্থার কর্মরত ব্যক্তিরা আর বাকি একজন ছিল জেমস ডব্লিউ. ম্যাককর্ড; যিনি রাষ্ট্রপতি পুনরায় নির্বাচন করার সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান ছিল।
  • ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডালের ডিপ থ্রোট ছিল বেনামী একজন মানুষ যিনি সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড এবং কার্ল বার্নস্টেইনকে সব তথ্য ফাঁস করে দিয়েছিলেন। ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডালের ৩০ বছর পরে জানা যায়, ডিপ থ্রোট ছিলেন এফবিআই-এর ডেপুটি ডিরেক্টর ডব্লিউ মার্ক ফেল্ট।
  • ১৭৭৪ সালের ৯ই আগষ্ট ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডালের বিষয়টি ধামাচাপ দেওয়ার জন্য তাকে অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আর পরবর্তীতে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।
  • জেরাল্ড ফোর্ড ১৯৭৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নিক্সনকে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ক্ষমা করেছিলেন।

 

 

 

Feature Image: thenewyorker.com 
References: 

01. The Watergate Story.  
02. Watergate Scandal. 
03. Watergate: The Scandal That Brought Down Richard Nixon