মিগ ২১: শতাব্দীর সেরা যুদ্ধ বিমান

140
0

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে মূলত যুদ্ধ বিমানের ব্যবহার শুরু। সেই সময় কাঠের ফ্রেমে তৈরি বিমান ব্যবহার করা হতো। এরপর এল লোহার ফ্রেমে তৈরি বিমান, ইঞ্জিনের তৈরি বিমান, পালটে গেল আকাশযুদ্ধের ধরণ-ধারণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন স্নায়ু যুদ্ধের সময় দুই পক্ষই আকাশ-পথে যুদ্ধ বিমান নিয়ে আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা করে। পশ্চিমা বিশ্বের বিমানের তুলনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিমানে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। তাদের বিমানগুলো ছিল সস্তা, প্রযুক্তিগত থেকে কিছুটা নিম্ন মানের।

স্নায়ু যুদ্ধের সময় থেকে মিকোয়ান ডিজাইন ব্যুরো বিভিন্ন ধরনের বিমান বানানো শুরু করে। যার মধ্যে ছিল মিগ-১৫, মিগ-১৭, এবং সুপারসনিক মিগ-১৯। যারই ধারাবাহিকতায় মিকোয়ান ডিজাইন ব্যুরো মিগ-২১ যুদ্ধ বিমান বানায়। তাদের তৈরি যুদ্ধ বিমানগুলোর মধ্যে মিগ- আর সুখোই সুখ-৭ সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধ বিমান ছিল। যার মধ্যে মিগ-২১ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছিল। 

ট্রেনিং এর সময় সার্বিয়ান মিগ-২১ যুদ্ধ বিমান। Image Source: www.aerotime.aero

মিগ-২১ (ন্যাটো রিপোটিং নাম-ফিজবেড) হলো বিশ্বের একটি সুপারসনিক যুদ্ধ বিমান এবং ইন্টারসেপ্টর বিমান। মিগ-২১ এর ডাকনামের মধ্যে রয়েছে বাললাইকা। যার অর্থ প্ল্যানফর্ম একই নামের তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের তৈরি। মিগ-২১ চারটি মহাদেশের আনুমানিক ৬০টির বেশি দেশের আকাশে উড়েছে। 

দক্ষ পাইলটের হাতে পড়লে মিগ-২১ হয়ে উঠে অতি ভয়ংকর। বর্তমান বিশ্বে অসংখ্য প্রযুক্তিগত অনেক যুদ্ধ বিমান রয়েছে কিন্তু মিগ-২১ এর সাথে সেসবের রয়েছে অনেক পার্থক্য। তবুও সমরক্ষেত্রে অবিরাম সাফল্যের বিবেচনায় মিগ-২১ যুদ্ধ বিমান অবশ্যই শ্রেষ্ঠ হওয়ার দাবি রাখে। মিগ-২১ এর কাজ চূড়ান্তভাবে শেষ হয় ১৯৫৫ সালের দিকে। ১৯৫৯ সালে প্রথম ফাইটার সার্ভিসে আনা হয়। 

মিগ-২১ হল একক পাইলট চালিত একটি যুদ্ধ বিমান৷ দৈর্ঘ্য ১৪.৫ মিটার এবং উচ্চতা ৪.১২৫ মিটার। মিগ-২১ এর সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘন্টায় ২৩,৫০ কিলিমিটার। এই বিমান আকাশ থেকে আকাশে, আকাশ থেকে মাটিতে সবদিকেই কার্যকর। মিগ ২১ এর মটো হল Attack and Keep Going অর্থ ‘হামলা করো এবং উড়ে যাও।’ 

তাছাড়া, এতে ব্যবহার করা হয়েছে শক্তিশালী ইঞ্জিন, হালকা বডি এবং ডেল্টা উইং। সংক্ষেপে মিগ-২১ পাইলটের বিমানও বলা হয়ে থাকে। যুদ্ধ বিমানটি যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্র বহন করতে পারে। একটি ২৩ মিলিমিটার কামান, দুই-পাঁচটি মিসাইল, সাথে আড়াইশো কেজির মতো বোমা বহন করতে পারে। মিগ-২১ এর উড়ার জন্য প্রায় আধা-কিলোমিটার রানওয়ের প্রয়োজন হয়।  

মিগ-২১ ককপিট; Image Source: www.pinterest.com

মিগ-২১ স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে পরবর্তী কয়েক যুগ সমরক্ষেত্রে অনেকটা চাতুরতার পরিচয় দিয়েছে। দক্ষ পাইলটের হাত পড়লে এই যুদ্ধ বিমান পশ্চিমা যুদ্ধ F-4 এর সাথেও টক্কর নিতে পারে। একজন ইউএস এয়ার ফাইটার বলেছিলেন,

‘মিগ-২১ যুদ্ধের জন্য অনেক কৌশলী ছিল এবং
ব্যবহারের আগে অনেক যত্ন নিতে হবে।’

মিগ-২১ ডিজাইন এবং প্রযুক্তিতে তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। যার ফলে এই যুদ্ধ বিমান প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করা হতো। প্রায় ২৬ বছরে ১১ হাজারের মতো মিগ-২১ উৎপাদন করা হয়েছিল।  

১৯৬৫ সালের শেষ দিকে শুরু হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ। মার্কিন বোমারুর জ্বালায় ভিয়েতনামের কোথাও টেকার অবস্থা ছিল না। বোমার আঘাতে নিহত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। এরই ফলশ্রুতিতে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬৬ সালে ভিয়েতনামী পাইলটদের  কাছে বেশ কিছু মিগ-২১ পাঠায়।

১৯৬৭ সালের শুরুর দিকে, উত্তর ভিয়েতনাম মার্কিনদের বিরুদ্ধে মিগ-২১ প্রথম ব্যবহার করে। প্রথম দিকে ভাবা হয়েছিল, মার্কিন যুদ্ধ বিমান এফ-৪ এর সাথে মিগ-২১ পেরে উঠবে না। কারণ দুই ইঞ্জিনের এফ-৪ ছিল সাইজে অনেক বড় এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে উন্নত। কিন্তু মিগ-২১ এর উন্নত ম্যানুভ্যারিটি, জোরালো গতি, দ্রুত উচ্চতায় ওঠার ক্ষমতা এবং নিখুঁত কামানের ব্যবহার। যার ফলে মার্কিনীদের অবস্থা অনেক শোচনীয় হয়ে উঠে। 

ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহৃত মিগ-২১; Image Source: theaviationgeekclub.com

১৯৬৬ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত মার্কিন বিমান বাহিনী ৬০টার বেশি মিগ-২১ যুদ্ধ বিমান ধ্বংস করেছে। তার বিপরীতে মিগ-২১ মার্কিনদের ১২০টির বেশি উন্নত মানের যুদ্ধ বিমান ধ্বংস করেছে। এ থেকে বোঝাই যাচ্ছে, বিমানটি ভিয়েতনাম যুদ্ধক্ষেত্রে দারুণ সফল ছিল। ব্রিটিশ লেখক রজার বনিফেস, দু’জন ভিয়েতনামী পাইলটের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, একজন হলো ফাম এনগক ল্যান; অন্যজন হলো এনগুয়েন নহট চিউ। তারা দু’জনই মিগ-২১ ব্যবহার করে যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল।

ফাম এনগোক ল্যান বলেন,

‘মিগ-২১ ছিল অনেক দ্রুতগতির এবং এতে দুটি অ্যাটল মিসাইল ব্যবহার হতো; যা ১০০০ থেকে ১২০০ গজের মধ্যে নিক্ষেপ করলে অত্যন্ত নির্ভুল এবং নির্ভরযোগ্য ছিল।’ 

অন্যদিকে চিউ বলেন,

‘আমি মিগ-২১ ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করি। কারণ এটি আরোহণ, গতি এবং অস্ত্রশস্ত্রের সমস্ত বৈশিষ্ট্যে উচ্চতর ছিল। অ্যাটল ক্ষেপণাস্ত্রটি খুব নির্ভুল ছিল। মিগ-২২ উড্ডয়ন করার সময় আমি সবসময় এফ-৪ ফ্যান্টমকে ধ্বংস করার ব্যাপারে আত্নবিশ্বাসী হতাম।’ 

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মিগ-২১ ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু আরবদের দক্ষ পাইলটের অভাবে এই যুদ্ধে মিগ-২১ তেমন ভাল কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। তাছাড়া, মিশরীয় বিমান বাহিনী, সিরিয়ান বিমান বাহিনী, এবং ইরাকি বিমান বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে মিগ-২১ প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করেছিল।

এই মিগ-২১ ব্যবহার করে সিরিয়ার পাইলটরা বিখ্যাত ‘কোবরা কৌশল’ আবিষ্কার করেছিল। যা শূন্য গতির কৌশল নামে একটি প্রতিরক্ষামূলক কৌশলে পরিণত হয়েছিল। ইরান-ইরাক যুদ্ধেও মিগ-২১ যুদ্ধ বিমানের ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মিগ-২১ ধ্বংস করেছে ৪৩টি ইরানী এফ-১৪ যুদ্ধবিমান। 

মিগ-২১ এবং এফ-৪ এর মধ্যে আকাশপথে যুদ্ধ; Image Source: www.pinterest.com

ভারত মিগ-২১ এর বৃহত্তম অপারেটর। যার জন্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে মিগ-২১ ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল। যুদ্ধের সময় মিগ-২১ এর সামনে পাকিস্তানের বিমান তেমন বেশি একটা সুবিধা করেত পারেনি। বাংলাদেশে ভাল দক্ষতা দেখানোর পর, কার্গিল যুদ্ধেও মিগ-২১ ব্যবহার করা হয়েছিল।

ভারতীয় বাহিনী প্রায় ১২০০টিও বেশি মিগ যুদ্ধ বিমান কিনেছিল। ভারতে মিগ-২১ এর ধারাবাহিক কর্মদক্ষতার কারণে, ইরাকসহ বেশ কয়েকটি দেশ মিগ-২১ পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের কাছে এসেছিল। ১৯৭০ এর দশকের গোড়ার দিকে, ভারতীয় বিমান ১২০ ইরাকি পাইলটকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। 

মিগ-২১ যুদ্ধ বিমানটি বিভিন্ন সমস্যা জর্জরিত। বিমানটি নামবার জন্য প্রয়োজন প্রায় আধা কিলোমিটার দীর্ঘ রানওয়ে। তাছাড়া, দক্ষ পাইলট ছাড়া এই বিমান নিয়ে আকাশপথে রাজত্ব করা সম্ভব না। যেমনটি আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় হয়েছিল। মিগ-২১ অনেক পুরাতন যুদ্ধ বিমান। যার ফলে অযত্নে রাখলে দূর্ঘটনা হওয়ার সম্ভবনা অনেক বেশি। ভারতীয় বিমান বাহিনীতে বহু বছর এই বিমান ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রচুর দূর্ঘটনার স্বীকার হয়ে অনেক ভারতীয় পাইলট মারাও গেছে। 

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর চিনা ভার্সন চেংদু এফ-৭; Image Source: bn.wikipedia.org

বর্তমানে অনেক প্রযুক্তিগত বিমান আবিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু সেই সময় মিগ-২১ যুদ্ধ বিমানকে টক্কর দেওয়ার মতো বিমান স্বয়ং মার্কিনীদের কাছেই ছিল না। বাংলাদেশের প্রথম এয়ার ফোর্সের ফাইটার ছিল মিগ-২১; যা সোভিয়েত ইউনিয়ন উপহার দিয়েছিল। সেটি এখনও জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী মিগ-২১ এর চিনা ভার্সন এফ-৭ যুদ্ধ ব্যবহার করে। সবকিছু মিলিয়ে, মিগ-২১ যুদ্ধ বিমানের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠত্ব হওয়ার দাবি রাখে। 

 

Feature Image: military-today.com 
References:

01. The Mig-21-Russia-Love. 
02. The Aircraft. 
03. Against-the-Migs-in-Vietnam. 
04. the-longevity-of-the-mig-21-fighter-a-cold-war-warrior-that-still-lives-on. 
05. The technology/MiG-21. 
06. The mikoyan-gurevich-mig-21-fighter.

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
নুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!